বাংলাদেশে জুয়া নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা

বাংলাদেশে জুয়া নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত জটিল ও দ্বৈত সত্ত্বাবিশিষ্ট। একদিকে, গণমাধ্যম আইনগত ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে জুয়ার ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়মিতভাবে তুলে ধরে সচেতনতা তৈরি করছে। অন্যদিকে, বিনোদন ও খেলাধুলা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের আড়ালে অনলাইন গেমিং এবং বাংলাদেশ জুয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রচারও পরোক্ষভাবে হয়ে থাকে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ সংবাদপত্র সমিতির একটি অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ১০টি বাংলা দৈনিক পত্রিকার গড়ে মাসে ৪৫টি নিবন্ধ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জুয়া সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে প্রকাশিত হয়, যার মধ্যে ৬০% থাকে সচেতনতামূলক এবং ৪০% থাকে বিনোদন বা ক্রীড়া বেটিং সংক্রান্ত।

গণমাধ্যমের সচেতনতামূলক ভূমিকার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো পুলিশের অপরাধ দমন বিভাগের সাথে সমন্বয় করে অবৈধ জুয়া ডেনের তদন্ত ও ভাঙার খবর সম্প্রচার। ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে শুধুমাত্র ঢাকা মহানগরীতে ১১৭টি অবৈধ জুয়া ক্যাসিনো ও লটারি ডেন ভাঙার খবর প্রধান সংবাদপত্রগুলোতে স্থান পেয়েছে। এই ধরনের প্রতিবেদনগুলোতে প্রায়শই জুয়ায় আসক্ত হয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক দুরবস্থার করুণ চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের মে মাসে দৈনিক ইত্তেফাক “জুয়ার নেশায় সর্বস্বান্ত এক যুবকের আত্মহত্যা” শিরোনামে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

তবে, গণমাধ্যমের জুয়া সংক্রান্ত বিষয়বস্তু নিয়ে একটি বিতর্কও বিদ্যমান। ক্রীড়া সংবাদ, বিশেষ করে ক্রিকেট ও ফুটবল কভারেজের সময়, বিভিন্ন অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন বা স্পনসরশিপ প্রায়শই সংবাদ মাধ্যমের পাতায় স্থান পায়। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (BCB) কর্তৃক ২০২২ সালে অনুমোদিত একটি সমীক্ষা অনুসারে, দেশের শীর্ষ তিনটি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের ক্রিকেট লাইভ সম্প্রচারে প্রতি ম্যাচে গড়ে ৮ থেকে ১২টি ভিন্ন ভিন্ন অনলাইন বেটিং সাইটের বিজ্ঞাপন দেখানো হয়। এই বিজ্ঞাপনগুলো প্রায়ই “ফ্যান্টাসি লিগ” বা “খেলোয়াড় পারফরম্যান্স ভবিষ্যদ্বাণী” এর মতো শব্দ ব্যবহার করে নিজেদের বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করে।

২০২৪ সালে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে জুয়া সংশ্লিষ্ট কনটেন্টের পরিসংখ্যান
মাধ্যমের ধরনজুয়া বিরোধী প্রতিবেদন (গড়/মাস)বেটিং সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপন/কনটেন্ট (গড়/মাস)মোট কভারেজে জুয়া বিষয়ক শতকরা হার
দৈনিক পত্রিকা (বাংলা)৩৮টি নিবন্ধ২৫টি বিজ্ঞাপন/স্পনসরড কনটেন্ট২.১%
টেলিভিশন নিউজ চ্যানেল২২টি খবর১৮০+ বার বিজ্ঞাপন সম্প্রচার১.৮%
অনলাইন নিউজ পোর্টাল৫৫টি নিবন্ধপ্রতি পৃষ্ঠায় গড়ে ১.২টি পপ-আপ৩.৫%

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন জুয়া সংক্রান্ত তথ্য ও প্রচারের একটি বড় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম এবং বিভিন্ন YouTube চ্যানেলের মাধ্যমে অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের টার্গেটেড বিজ্ঞাপন চালায়। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক কমিশন (BTRC) এর ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, মাসে প্রায় ৫০০০টি Social Media অ্যাকাউন্ট জুয়া সংশ্লিষ্ট কনটেন্ট প্রচারের জন্য ব্লক করা হয়েছে। কিন্তু নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি করে এই কার্যক্রম আবারও চালু হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় ভাষায় তৈরি কনটেন্ট, যেমন “১০ টাকায় বেট করে কীভাবে ১০০০ টাকা জিতবেন” বা “স্লট মেশিনের গোপন কৌশল” শিরোনামের ভিডিওগুলো তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দ্রুত ভাইরাল হয়।

গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল এই বিষয়টির ওপর নজরদারি করছে। কাউন্সিল ২০২২ সালে একটি নির্দেশিকা জারি করে যেখানে বলা হয়েছে, কোনো সংবাদ মাধ্যম সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জুয়া প্ল্যাটফর্মের প্রচার করতে পারবে না। কিন্তু এই নির্দেশিকা কার্যকর করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক সংবাদপত্র “বিনোদনমূলক গেমিং” বা “স্কিল-বেসড গেম” ক্যাটাগরিতে অনলাইন ক্যাসিনোর বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে নির্দেশিকা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। আবার, কিছু গণমাধ্যম ইউটিউবার বা সেলিব্রিটিদের সাথে Collaboration করে “গেম রিভিউ” এর আড়ালে জুয়া প্ল্যাটফর্মের প্রচার চালায়।

জুয়া নিয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা শুধু সংবাদ পরিবেশনেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ফ্যাক্টরও বটে। মিডিয়া অ্যানালিটিক্স ফার্ম ‘মিডিয়া ম্যাট্রিক্স’-এর তথ্য মতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে বেটিং ও গেমিং সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপনের বাজেট ছিল প্রায় ৩২০ কোটি টাকা। এটি মোট মিডিয়া বিজ্ঞাপন বাজেটের প্রায় ৭%। অর্থাৎ, জুয়া সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপন থেকে গণমাধ্যমের আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে, যা এই বিষয়ক কভারেজকে আরও জটিল করে তোলে।

জনমত গঠনে গণমাধ্যমের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সরকারও জুয়া বিরোধী ক্যাম্পেইন চালায়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে National Mental Health Institute এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের যৌথ উদ্যোগে “জুয়া নয়, জীবন বেছে নিন” শিরোনামে একটি জাতীয় ক্যাম্পেইন ২০২৩ সালে চালু হয়। এই ক্যাম্পেইনের আওতায় ২০০টির বেশি রেডিও জিংগল এবং ৫০টি টেলিভিশন বিজ্ঞাপন তৈরি করা হয়, যা জুয়ার সামাজিক ও মানসিক ক্ষতির দিকগুলো তুলে ধরে।

তথ্য প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে জুয়া প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের মার্কেটিং কৌশলও পরিবর্তন করছে। তারা এখন সরাসরি বিজ্ঞাপনের বদলে Content Marketing এবং Influencer Marketing-এর দিকে ঝুঁকছে। অনেক জনপ্রিয় বাংলাদেশি YouTuber বা Social Media Influencer তাদের গেমিং ভিডিওতে নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের নাম উল্লেখ করেন বা লিঙ্ক শেয়ার করেন, যা দেখতে সাধারণ গেমিং কনটেন্টের মতো মনে হলেও আসলে তা জুয়া প্ল্যাটফর্মেরই একটি সূক্ষ্ম প্রচার। বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের মতে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত Influencer মার্কেটিং এর মাধ্যমে জুয়া প্ল্যাটফর্মে নতুন রেজিস্ট্রেশন বেড়েছে প্রায় ৩৫%।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সামাজিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে, সংবাদ মাধ্যমের জন্য রাজস্ব আয় গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে, জনস্বার্থে ক্ষতিকর বিষয়ের প্রচার রোধ করাও তাদের দায়িত্ব। বাংলাদেশে জুয়া নিয়ে গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ ভূমিকা অনেকটাই নির্ভর করবে সরকারি নিয়মকানুন কতটুকু কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয় এবং মিডিয়া হাউসগুলো তাদের নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ কতটুকু প্রাধান্য দেয় তার উপর। বর্তমানে, এটি একটি ধূসর অঞ্চল যেখানে শিক্ষামূলক কনটেন্ট এবং বাণিজ্যিক প্রচার পাশাপাশি সহাবস্থান করছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping Cart
Scroll to Top